ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অনুপ্রেরণা : শিরাজীর সাহিত্যকর্ম
ব্রিটিশ উপনিবেশিকদের শোষণের বিরুদ্ধে যুগে যুগে অসংখ্য আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। স্বাধীনতাকামী পরাধীন ভারতের হিন্দু-মুসলিম স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করেছেন। সভা-সমাবেশ, মিছিল, সিপাহী বিদ্রোহ, শ্রমিক বিদ্রোহ, তিতুমীরের নারিকেলবাড়িয়ায় বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছেন মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার জন্য। পরাধীন ভারতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কেউ কলম ধরার সাহসী হয়নি। কলম ধরলে তাকে সীমাহীন জুলুম, নির্যাতন এমনকি কারাগারে নিক্ষিপ্ত হতে হয়েছে।
Printed Edition

জসিম উদ্দিন মনছুরি
ব্রিটিশ উপনিবেশিকদের শোষণের বিরুদ্ধে যুগে যুগে অসংখ্য আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। স্বাধীনতাকামী পরাধীন ভারতের হিন্দু-মুসলিম স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করেছেন। সভা-সমাবেশ, মিছিল, সিপাহী বিদ্রোহ, শ্রমিক বিদ্রোহ, তিতুমীরের নারিকেলবাড়িয়ায় বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছেন মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার জন্য। পরাধীন ভারতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কেউ কলম ধরার সাহসী হয়নি। কলম ধরলে তাকে সীমাহীন জুলুম, নির্যাতন এমনকি কারাগারে নিক্ষিপ্ত হতে হয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের অবদান অনস্বীকার্য। যেসব মুসলিম মনীষী ভারতের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করেছেন তন্মধ্যে সৈয়দ আমীর আলী, মোহাম্মদ আলী, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অন্যতম। মুসলিম মনীষীদের মধ্যে যারা সাহিত্যকর্ম দিয়ে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনকে বেগবান করেছেন তাদের মধ্যে সৈয়দ আমীর আলী, ইসমাইল হোসেন শিরাজী, কাজী নজরুল ইসলাম, মোজাম্মেল হক, কায়কোবাদ, মীর মশাররফ হোসেন সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ইসমাইল হোসেন শিরাজী নজরুলের অগ্রজ। মূলত নজরুল শিরাজী দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
ইসমাইল হোসেন শিরাজীর লেখনীতে ফুটে উঠেছে স্বদেশপ্রেম, বিজ্ঞানমনস্কতা, সামাজিক সচেতনতা, নারীদের অনগ্রসরতার বিষয়, আত্মসম্মানবোধ, বিদ্রোহীতা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
তিনি পরাধীন ভারতের সিরাজগঞ্জে ১২৮৬ বঙ্গাব্দ ২রা শ্রাবণ ১৮ রমজান ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দের ১৩ জুলাই শুক্রবার জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মৌলবি শাহ সৈয়দ আব্দুল করিম সাহেব ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার, অমায়িক, উদার-সরলমনা, তেজস্বী এবং পরোপকারী লোক। মাতা নুরজাহান খানম অত্যন্ত চরিত্রবান, জ্ঞানী ও সজ্জন মহিলা ছিলেন। বলা হয় তার মায়ের গুণেই শিরাজী গুণান্বিত হয়েছিলেন। তার মাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল শিরাজীর বিষয়ে। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, শিরাজী গর্ভ অবস্থায় তিনি মহা মনীষীদের কাহিনী, সাধক ও বাগ্মী ব্যক্তিদের বিভিন্ন বিষয়াদি পাঠ করেছিলেন। উল্লেখযোগ্য হলো- কারবালার ঘটনা, ইসলামী মনীষীদের জীবনী, ইসলামের বিভিন্ন যুদ্ধের কাহিনী, ফাতহু শ্বাম, ফাতহুল মেছের, ফতহুল আজম, রামায়ণ, মহাভারত নেপোলিয়নের জীবনী প্রভৃতি ।
তার জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে তার পিতার একটি স্বপ্ন কাহিনী বর্ণনা করা যায়, শিরাজীর জন্মের রাত্রিতে তার পিতা সৈয়দ আব্দুল করিম একটি স্বপ্ন দেখেন। একটি জ্যোতিষ্ক পাখি নীলিমা হতে ধীরে ধীরে চক্রাকারে নিচের দিকে নেমে আসছে। তার পায়ে ছিন্ন শিকল দোদুল্যমান। পাখিটি চক্রাকারে নিচের দিকে নেমে আসছে সিরাজগঞ্জ শহরের উপর। অপূর্ব টিয়া পাখিটি দেখবার জন্য রাস্তায় শত শত মানুষ বের হয়ে পড়লেন। পাখিটি সবার মাথার উপর চক্রাকারে ঘুরতে লাগলেন। কিন্তু কেউ ধরতে পারলেন না। পরবর্তীতে সৈয়দ আব্দুল করিমের ঘরে ঢুকে পড়লেন। তার স্বপ্ন সত্যি হয়েছিলো। বাংলার আকাশে শিরাজীর মতো বহু গুণে গুণান্বিত মহাপুরুষের জন্ম খুব কমই হয়েছে। তাঁর পিতামহ তার নাম রেখেছিলেন রুস্তম, দাদী নাম রেখেছিলেন সেরাজ উদ্দিন। কিন্তু মায়ের রাখা নামে অর্থাৎ শিরাজী হিসেবে তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় ১২৯১ বঙ্গাব্দ, তথা ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে পাঁচ বছর ৬ মাস বয়সে। এই ছোট্ট বয়সে তিনি বিদ্যালয়ে যান। তিনি ছোটকাল থেকেই মেধাবী, চিন্তাশীল, আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন, বুদ্ধিমত্তা, তেজস্বিতায় অবর্ণনীয় ছিলেন। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় স্কুলে একটি কবিতা প্রতিযোগিতা হয়। হেড মাস্টার নাগেন্দ্রনাথ সেন মহাশয় লংম্যান রয়েল রিডারস সেকেন্ড পার্ট হইতে দ্য ওয়াসফ এন্ড বী অর্থাৎ বোলতা ও মৌমাছি কবিতাটি বাংলায় তরজমা করতে দেন তার ছাত্রদের। অসংখ্য ছাত্রের মধ্যে মাত্র পাঁচজনই এর বঙ্গানুবাদ করে কবিতা লিখতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রতিযোগিতায় ইসমাইল হোসেন শিরাজী পুরস্কার লাভ করেন। কবিতা শুনে অনেকে তাকে মহাকবি হিসেবে ভেবে নিয়েছিলেন। তার কবিতা ছিল এইরূপ -
একদা একটি অলি গুণ গুণ রব তুলি
বোলতার নিকট দিয়া যায়Ñ
দেখে বোলতা তারে কয় শুন অলি মহাশয়
লোকে নাকি আদরে তোমায়।
আমার এই পৃষ্ঠদেশ ঝক ঝক করে বেশ
ঠিক যেন সোনার বরণ।
তথাপি আমার তরে কেহ না আদর করে
বল দেখি ইহার কারণ ?
তিনি কবিতায় নয় গদ্য রচনায়ও অনন্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তার জ্ঞানপিপাসা ছিলো অনেক বেশি। ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য এবং বিজ্ঞান এসব বিষয়ে তার বেশ অনুরাগ ছিলো। কবিতা পড়তে তিনি পরম আনন্দবোধ করতেন। এ সময় তিনি পাঠ করে ফেলেন যদুগোপাল চট্টোপাধ্যায় সংকলিত গদ্যপাঠ, সদ্ভাব, মঙ্গল শতক, কবি আনন্দ চন্দ্র মিত্রের হেলেনা উদ্ধার, ভারত মঙ্গল এবং মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ, ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল, বিদ্যাসুন্দর, হেমচন্দ্রের বৃত্ত সংহার ইত্যাদি।
ইসমাইল হোসেন শিরাজী অর্থাভাবে মাধ্যমিকের গ-ি পারার পর আর বেশি দূর আগাতে পারেননি। তিনি স্বশিক্ষিত হয়ে অগাধ পা-িত্য বা বাগ্মিতা ও সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় কবিতা, প্রবন্ধ লেখার কলাকৌশল আত্মস্থ করেন। তখন থেকে প্রকাশিত হয়ে আসছে তার কবিতা, প্রবন্ধ ও সমালোচনা গ্রন্থ। জোর দেন তৎকালীন সমসাময়িক পত্র পত্রিকা বিশেষ করে মিহির, সুধাকর, সুলতান ও ইসলাম প্রচারক প্রভৃতি কাগজে তার লেখনী নিয়মিত ছাপা হতো।
তার বিস্ময়কর প্রতিভার বিকাশ ঘটে তার প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ অনল প্রবাহের (১৯০০ খ্রিষ্টাব্দ) মধ্য দিয়ে। তার পূর্বসূরীদের মধ্যে মধুসূদনের সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য মেঘনাদবধ ১৮৬১, বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশ নন্দিনী ১৮৬৪, ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু প্রকাশিত হয়। মুসলমানদের মধ্যে মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধুকে বলা হয় মুসলমান সাহিত্যিকদের মধ্যে প্রকাশিত প্রথম ঐতিহাসিক রচনা। বিখ্যাত ধর্ম-বক্তা মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুউল্লাহ সিরাজগঞ্জের বড়ইতলী মাঠে বিরাট জনসভায় বক্তব্য প্রদান করেন। একই মঞ্চে ইসমাইল হোসেন শিরাজী ‘অনল প্রবাহ’ নামে একটি কবিতা আবৃত্তি করলে তা শুনে মুনশী সাহেব মুগ্ধ হন ।
মুনশী সাহেব নিজ ব্যয়ে ১৩০৬ বঙ্গাব্দে তা পুস্তিকাকারে প্রকাশ করেন। ১৩০৬ বঙ্গাব্দে তৃতীয় বর্ষের ইসলাম প্রচারকে শিরাজীর ‘বঙ্গ ও বিহার বিজয়’ প্রকাশিত হয়। ১৩০৬-১৩০৭ বঙ্গাব্দে তখনকার প্রসিদ্ধ পত্রিকা ইসলাম প্রচারকে এবং সাধু মিয়া সম্পাদিত প্রচারকে প্রকাশিত হয়েছিল তার কয়েকটি বিখ্যাত কবিতা। এর সকল রচনার চিন্তাদর্শ ও ভাবৈশ্বর্য দেখে দেশবাসী তাঁর প্রতিভার শক্তি ও বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে আশান্বিত হয়ে ওঠে। এই কবিতাগুলির মধ্যে-
১. অনল প্রবাহ ২. তুর্যধ্বনী ৩. মূর্চ্ছনা ৪. বীর- পূজা .৫ অভিভাষণ : ছাত্রগণের প্রতি ৬. মরক্কো- সংকটে ৭. আমীর -আগমনে ৮. দীপনা ও ৯.আমীর অভ্যর্থনা ।
এই ৯ টি কবিতা নিয়ে ১৩০৭ বঙ্গাব্দ বা ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে ‘অনল প্রবাহ’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। কবির উক্তি-
আবার উত্থান লক্ষ্যে
বহাও জগত- বক্ষে।
নব-জীবনের খর প্রবাহ প্লাবন।
আবার জাতীয় কেতু
উড়াও মুক্তির হেতু
উঠুক গগনে পুনঃরক্তিম তপন।
‘অনল প্রবাহ’ কাব্যের এই অগ্নিবাণী ভাবের তীব্রতা ও ভাষার ওজস্বিতা গুণে সমাজের সর্বত্র এক অভূতপূর্ব আলোড়নের সৃষ্টি করে। সুদানের মহাকবি মোহাম্মদ মেহেদী যে আরবি কাফিয়ার উদ্দীপন রসে জাতীয় জীবনের উদ্বোধন করেছিলেন ‘স্বাধীনতা বন্দনা’ কবিতাটি তারই মর্মানুবাদ। কিন্তু সেদিন এই উপমহাদেশের জন্য এই মুক্তির আহ্বান ছিল অপরিমাণ প্রেরণাময়Ñ
পতিত জাতির উদ্ধার হেতু
উড়াও আকাশে রক্তিম সেতু
জাগুক মাতুক ছুটুক দেশের আবাল - বৃদ্ধ -বণিতা ।
জয় জয় জয় স্বাধীনতা।
অনল প্রবাহ কবিতায় মুসলমানদের জেগে ওঠার জন্য তিনি এভাবেই বলেছেন-
আর ঘুমিও না নয়ন মেলিয়া
উঠরে মোসলেম উঠরে জাগিয়া
আলস্য জড়তা পায়েতে ফেলিয়া
পুত বিভু নাম স্মরণ করি।
স্বদেশীদের জাগিয়ে তুলতে ও স্বাধীনতা সংগ্রামে উজ্জীবিত করতে তিনি বলেন-
ছি ছি ছি! কি লাজ! ফেটে যায় প্রাণ
সবাই তোদেরে করে অপমান
তবুও কি তোরা রহিবি অজ্ঞান
আলস্য সজ্জায় নিদ্রিত হইয়া।
ভারতীয় মুসলমানদেরকে জাগ্রত করার লক্ষ্যে কবি তূর্যধ্বনী কবিতায় বলেন-
হে মোসলেম। কতকাল, মোহঘুমে রহিবে পড়িয়া
বারেকের তরে কিহে উঠিবে না নয়ন মেলিয়া?
তোমারে নিদ্রিত দেখি, মহানন্দে তস্করের দল,
লুটিয়া লইল তব উদ্যানের ফুল ফল।
এ সব কবিতায় আধিপত্যবাদী ব্রিটিশদের কথা অতি চমৎকারভাবে চিত্রায়ণ করা হয়েছে। সাথে সাথে দেশবাসীকে শোষক -নিপীড়ক, আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে উজ্জীবিত হওয়ার কথা বলেছেন। বীরপূজা কবিতায় তিনি সংগ্রামে উজ্জীবিত হওয়ার জন্য সবাইকে একতাবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। যেমনÑ
দূর অতীতের গর্ভে দেখিনু চাহিয়া
কি মহা পুলক
বঙ্গে এক দীপ্ত জ্যোতি আসিছে ছুটিয়া
ছড়ায়ে ঝলক।
উন্মেষণা কবিতায় কবি মুসলমানদেরকে জেগে উঠতে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে আহ্বান জানিয়েছেন।
কেহ কি জাগিস বঙ্গে!
কেহ কি আছিস মুসলমান
কি স্বর্গীয় প্রভা জ্যোতিষ্মান।
এভাবে অনল প্রবাহ কাব্যের প্রতিটি কবিতায় প্রতিটি শ্লোকে স্বাধীনতার কথা, সংগ্রামের কথা, উজ্জীবনের কথা, প্রেরণার কথা, আগ্রাসী ও শোষকদের বিরুদ্ধে তীব্র খড়ক ধ্বনিত হয়েছে। ইসমাইল হোসেন শিরাজী ছিলেন খাঁটি দেশপ্রেমিক। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন বাংলা সরকার অনল প্রবাহ বাজেয়াপ্ত করেন। এবং ১২৪ (ক) ১৫৩,১১৭ ধারা অনুসারে গ্রন্থকারের প্রতি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। শিরাজী তখন সুলতান সম্পাদক মাওলানা মোঃ মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর সাথে উত্তরবঙ্গে প্রচারকার্যে লিপ্ত ছিলেন।
তিনি পত্রিকায় পরোয়ানার খবর পেয়ে অবিলম্বে কলকাতায় রওয়ানা হন। তার সাধের মহাকাব্য ‘মহাশিক্ষা’ ততদিনে অর্ধেক প্রায় বিরচিত হয়েছে এ অবস্থায় কারাগারে গেলে কাব্যখানির অবশিষ্টাংশ রচনার মেজাজ (সড়ড়ফ) হয়তো জীবনে আর পাওয়া যাবে না। তাই তিনি কিছুকাল অজ্ঞাতবাস থেকে কাব্যখানি সমাপ্ত করার মিশন মনে করেন। তিনি ব্রিটিশ এলাকার বাহিরে ফরাসি অধিকৃত চন্দননগরে গিয়ে দীর্ঘ আট মাস আত্মগোপনে ছিলেন। তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তৎকালীন সরকার ৫০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। কিন্তু গোয়েন্দাদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ১৩১৭ বঙ্গাব্দের ২১ আষাঢ় তারিখে মহাশিক্ষা মহাকাব্যের রচনা সমাপ্ত করেন। অতঃপর তিনি কলকাতায় গিয়ে চীপ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার সুইচ হোর আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। আদালতে তার পক্ষে মামলা পরিচালনা করেছিলেন ব্যারিস্টার মিস্টার বি চি চ্যাটার্জী। কিন্তু বিচারে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রচারের অভিযোগে তার প্রতি দু’ বছরের সশ্রম কারাদ-াদেশ হয়। অর্থভাবে হাইকোর্টে আপিল দায়ের করা সম্ভবপর হয়নি। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দের ১৪ মে তারিখে তিনি কারামুক্ত হন। তার কারা কাহিনী পরবর্তীকালে মাসিক সাধনায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।
ইসমাইল হোসাইন শিরাজীর কবিতা নজরুলকে দারুণভাবে অনুরণিত করেছিল। নজরুলের বাণীতে শোনা যায় ইসমাইল হোসেন শিরাজী ছিলেন আমার পিতৃতুল্য। একদিন আমরা যার কবিতা পড়েছি, মুখস্থ করেছি আজকেই কিনা তার হাত থেকে একটি খাম পেলাম। খামে লেখা ছিলো তোমার জন্য ১০ টাকা দিলাম খুশি হয়ে। তুমি না করতে পারবে না। যদি ১০ হাজার টাকা থাকতো আমি দশ হাজার টাকাই দিয়ে দিতাম। কিন্তু দশ টাকা দিলাম। তুমি এটা নিবে কিছু মনে করো না। নজরুলের উক্তিতে শোনা যায়, একদিন শিরাজী সাহেবের ১০ টাকা হাতে এসে পৌঁছায়। তার লেখা ‘’তোমার লেখা পড়িয়া সুখী হইয়া দশটি টাকা পাঠাইলাম। ফিরাইয়া দিওনা ব্যথা পাইব। আমার থাকিলে দশ হাজার টাকা পাঠাইতাম।’ এভাবেই কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইসমাইল হোসেন শিরাজী দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি শিরাজী সাহেবের মতো আনন্দময়ীর আগমনে কবিতা লিখে কারাবরণ করেন।
ইসমাইল হোসেন শিরাজী একাধারে বিজ্ঞানমনস্ক লেখক, সমাজ সংস্কারক, রাজনীতিক, সাংবাদিক ও ধর্মবেত্তা। তিনি জামাল উদ্দিন আফগানি দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন। পরোপকারী হিসেবেও তার খ্যাতি অনন্য। তুরস্কের যুদ্ধে তিনি বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসক টিমের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি স্বরাজ আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন। তার বাগ্মিতা ছিল অনলবর্ষী। তিনি তাঁর সাহিত্যকর্ম ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন। তাঁর ৮২ টি জনসভায় ব্রিটিশ সরকার ১৪৪ ধারা জারি করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে ব্রিটিশ সরকার তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ৫০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। তা থেকে অনুমান করা যায় তার অনলবর্ষী বক্তৃতা ও স্বদেশ প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত। বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশ নন্দিনীর প্রতিবাদে তিনি লিখেছিলেন রায় নন্দিনী। তার প্রবন্ধ, উপন্যাস, গান ও কবিতায় দেশপ্রীতি, সমাজ সংস্কার, বিজ্ঞানমনস্কতা ও নারী সচেতনতা ইত্যাদির পরিচয় ফুটে উঠেছে। তাঁর মহাকাব্য ‘মহাশিক্ষা’ মহাকাব্যধারার অনন্য সংযোজন। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ হচ্ছে, সাহিত্যচর্চা ও জাতীয় জীবন, মাতৃভাষা ও মুসলমান, সাহিত্য শক্তি, সাধনা ও সিদ্ধি, সাহিত্যের ধারা ও উপন্যাসের গতি, শক্তির প্রতিযোগিতা, সাহিত্যের প্রভাব ও প্রেরণা, সাহিত্যের উদ্দেশ্য ও গতি, সমাজ ও সাহিত্য, সাড়া, জাগরণ, আর্তনাদ, আত্মবিশ্বাস, আত্মপরিচয়, সম্ভাষণ, জাতীয় জীবনে নারীশক্তি, শিক্ষার পরিণাম, বেদনা, ইতিহাস চর্চার আবশ্যকতা, জীবন প্রবাহ প্রভৃতি তাঁর রচিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ।
উপন্যাস রায় নন্দিনী, তারাবাঈ, ফিরোজা বেগম ও নুরুদ্দীন। এসব উপন্যাসে ফুটে উঠেছে তার চরিত্র নির্মাণ কুশলতা, স্বদেশ প্রেম, সমাজ সংস্কার ও বিপ্লবের কথা।
এছাড়া তিনি গান রচনা করেও অনন্য সাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি একাধারে সাংবাদিক রাজনীতিবিদ, সমাজ সংস্কারক, সংগঠক, ধর্মীয় চিন্তাবিদ হিসেবে সমধিক পরিচিত।
স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ এই মহান মনীষী বিখ্যাত সাহিত্যিক ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ই জুলাই ১৩৩৮ বঙ্গাব্দের ৩০ আষাঢ় বৃহস্পতিবার রাত ২ ঘটিকায় দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে নিজ বাড়িতে নশ্বর দেহ ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে তুরস্কের সুলতানসহ বহু রাজনীতিবিদ শোক জ্ঞাপন করেন। তাঁর মৃত্যুর শতবার্ষিকী উদযাপিত হওয়ার কাছাকাছি হলেও তিনি বাঙালি জাতির জন্য রেখে গেছেন অনন্য সাধারণ সাহিত্য কর্ম ও বিপ্লবী চেতনা। বিশেষ করে তাঁর প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ অনল প্রবাহ স্বাধীনতা সংগ্রামে, জনসচেতনতায় ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। বিপ্লবী সাহিত্যকর্ম রচনা করে ইতোপূর্বে তিনি ছাড়া আর কেউ কারাবরণ করেননি। বাঙালি কবিদের মধ্যে স্বদেশ প্রীতিতে বিদ্রোহী ইসমাইল হোসেন শিরাজীর অনল প্রবাহ অগ্রগণ্য। অনল প্রবাহ বেঁচে থাকুক স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে, জালিমের বিরুদ্ধে, নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে, সমাজ সচেতনতায়, স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য অবদানে উজ্জীবিত হয়ে।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ইসমাইল হোসেন শিরাজীর অনলবর্ষী বক্তৃতা, তুখোড় সাংবাদিকতা, বিদ্রোহী সাহিত্যকর্মের পথ ধরে আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম স্বদেশভূমি। যতদিন বাংলা সাহিত্য থাকবে ততদিন তাঁর সাহিত্যকর্ম কালজয়ী হয়ে থাকবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক