সুখের দিনে দুঃখের দিনে
জীবনের লম্বা একটি সময় পার করে এসে বাবার ভাগ্য চাকা ঘুরে গেল বলতেই হবে। শূন্যতার গন্ডি পেরিয়ে জীবন পুণ্যতায় ভরে যেতে যেতে বাবার বয়সও ঠেকেছে পঞ্চাশের সীমানায়। এ বয়সে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষকে রোগব্যাধি নিয়ে যতখানি অসুস্থ থাকার কথা, বাবা ঠিক ততখানি সুস্থ। তারপরও কোন কোন ক্রান্তিকালে বাবা এতটাই রোগে ভোগেন যে তাকে শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের বেড মাড়িয়ে আসতে হয়। স্বামীর এমন পরিস্থিতি দেখে বিচলিত হতে সময় লাগে না আমার সংগ্রামী মায়ের।
Printed Edition

জোবায়ের রাজু
জীবনের লম্বা একটি সময় পার করে এসে বাবার ভাগ্য চাকা ঘুরে গেল বলতেই হবে। শূন্যতার গন্ডি পেরিয়ে জীবন পুণ্যতায় ভরে যেতে যেতে বাবার বয়সও ঠেকেছে পঞ্চাশের সীমানায়। এ বয়সে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষকে রোগব্যাধি নিয়ে যতখানি অসুস্থ থাকার কথা, বাবা ঠিক ততখানি সুস্থ। তারপরও কোন কোন ক্রান্তিকালে বাবা এতটাই রোগে ভোগেন যে তাকে শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের বেড মাড়িয়ে আসতে হয়। স্বামীর এমন পরিস্থিতি দেখে বিচলিত হতে সময় লাগে না আমার সংগ্রামী মায়ের।
মা তো সংগ্রামই ছিলেন। জীবনের সেইসব লম্বা অতীতে দেখতাম মা তার সংসার জীবনে কিছু কিছু মানুষের সাথে কি ভয়াবহ সংগ্রামই না করেছেন।
একান্ত আপনজন হওয়ার পরও সে সময়ে যারা আমাদের সাথে দূরত্ব বজায় রেখেছেন নিজেদের স্বার্থে, আজ আমাদের সুখের দিনে তারা কতই না কাছের। অথচ এক সময় আমরা পার করেছি মানবেতর দিন। তখন পাশে কেউ থাকুক আর না থাকুক, অভাব আর অনটনÑএই দুটি জিনিস ছিল আমাদের রোজদিনের সঙ্গ। যথার্থ শিক্ষিত আর সুবোধ যুবক হওয়ার পরও বাবার জন্য চাকরিটা জুটতো না। আয় রোজগারহীন জীবনে একজন মানুষ কতখানি অসহায়, বাবা সেটা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছেন কি না কে জানে!
একমাত্র সন্তানকে নিত্য নিরামিষ খাইয়ে খাইয়ে অভ্যাস করে ফেলেছেন, বাবা মা এই শোকে দুজনের করুণ মুখ দেখতে দেখতে আমার বয়স যখন দশ পেরিয়ে এগারোতে, বাবা মা তখনও তাদের দ্বিতীয় সন্তানকে পৃথিবীতে আনার কথা ভুলেও চিন্তা করতে পারেননি। হয়তো ভয় ছিল, নবজাতক সন্তানটিকে কিভাবে বড় করবেন! ভাঙা ঘরের টিনের ফুটো দিয়ে মধ্যরাতের অপ্রত্যাশিত বৃষ্টিতে ভিজে চোখ থেকে ঘুম পালাতো আমাদের।
রাতের নিশীথে দুজন স্বামীÑস্ত্রী অস্থির হয়ে থাকতেন তাদের সন্তানটির সর্দি কাশি লেগে যাবে বলে। সর্দি কাশির মতো শিশু রোগে আক্রান্ত হলে যে ডাক্তারের শরনাপন্ন হতে হবে। তখন কোথায় পাবেন টাকা! এই ভয়!
অবাক লাগত যে আমাদের চারপাশে তখন এত এত বিত্তবানদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমরা কখনো নেমন্তন্ন পেতাম না। বিশেষ সব দিনে যখন ওইসব বাড়ি থেকে পোলাওÑকোরমার রমরমা লোভনীয় ঘ্রাণ বাতাসে ভেসে আসতো নাকে, তখন যে আমার পেটের ক্ষুধা কেবল বাড়তো।
পুকুর ঘাট থেকে মা বিনা পয়সায় কচুশাক আর কলমিশাক তুলে এনে পাতিলে নাড়াচাড়া করতেন এক বিষাদ ঘোর মুখে।
মনে আসে, সে ছিল এক পড়ন্ত দুপুর। ধার চাওয়া টাকা না পেয়ে মা বড় ফুপুর বাড়ি থেকে ফিরলেন রোদ্রতপ্ত ঘামে ভেসে একাকার হয়ে। জ্বরে আক্রান্ত বিছানায় আধশোয়া স্বামীকে মা যখন চাপা গলায় বললেনÑ‘তোমার বোন টাকা তো দেয়নি, ফকিন্নি বলে আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে।’ শুনে বাবা চুপচাপ শুয়ে রইলেন। তার জ্বর যে বাড়তেই লাগল। মা তো নিরুপায়! হায় টাকা পাবেন কোথায়! স্বামীর চিকিৎসার জন্যে ননদের কাছে টাকা ধার চাইতে গিয়ে অপমানিত হয়ে খালি হাতে ফিরে আসা আমার দায়িত্বশীল মা জলপট্টি দিয়ে স্বামীর সেবায় পুরোপুরি মিশে গেলেন। সন্ধ্যার পরপরই বাবা জ্বরের তীব্রতা কমে তিনি পুরোপুরি সুস্থ কোন রকম ঔষধ-বড়ি ছাড়াই। সেদিনের আরোগ্য হয়তো ছিল বাবার প্রতি সৃষ্টিকর্তার বিশেষ করুণা।
তারপর সময় বয়ে চলা। অভাব অনটনের কোন পরিবর্তন নেই। তবুও বেঁচে থাকা। দুর্বিষহ জীবনের পথ চলতে চলতে একদিন বাবার সামনে এসে থমকে দাঁড়ায় সেই ভাগ্য দেবতা। স্টাডি লাইফে ক্লাসের সেরা ছাত্রটি হওয়ার সুবাদে যে মতিন স্যার বাবাকে বিশেষ পছন্দ করতেন, সংসার জীবনের সেই অগাধ সম্পত্তির মালিক নিঃসন্তান মতিন স্যার তার প্রিয় ছাত্রকে তার সম্পত্তির দুই শতাংশ দান করেছেন।
অভাব জিনিসটা আমাদের থেকে দূর হতে থাকে। কুঁড়েঘর ছেড়ে আমরা উঠি মার্বেল পাথরে সুনিপুণ সজ্জিত রাজপ্রাসাদের মতো অট্টালিকায়।
জীবনযুদ্ধ থেকে ক্রমেই মুক্তি পেতে থাকেন আমার মা। দিনে দিনে আমরা যখন বুঝতে পেরেছি টাকা পয়সা থাকলেও সমাজ মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করে, তখন আমারও বয়স বেড়েছে সাতাশ। জীবনের এ পর্যায়ে এসে ভাবি পেছনে কি কঠিন যাপিত জীবনই না ফেলে এসেছি। আজ আমরা সংসারে কতই না সুখি! এই সুখের বেলায় এসে দেখি এক সময় যাদের কাছে আমরা ছিলাম মূল্যহীন, গণনার বাইরে, আজ তাদের কাছে আমাদের কত কদর। পাড়ার কারো পারিবারিক অনুষ্ঠানে নেমন্তন্ন আমরাই পাই সবার আগে।
২. শ্বাসকষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে বাবা যখন আমাকে নিয়ে তিনদিন পর হাসপাতাল থেকে ফিরলেন, বাড়ি এসে দেখি ঘরভর্তি আত্মীয় স্বজন।
ফল-ফলাদি আর অভিজাত সব খাবার নিয়ে তারা বাবাকে দেখতে এসেছেন। বাবার শোকে তাদের অনেকে কাতর হয়ে অশ্রুও ফেলেছে দেখলাম। এসব দেখে আমার বুকের অতলে জমে থাকা ঘৃণারা প্রতিবাদের মতো গর্জে ওঠে। আমাদের দুর্দিনে কোথায় ছিল তাদের এসব সাজানো গোছানো পরিপাটি বেদনা?
পাতিলে মোরগ পোলাও বসিয়ে মা যখন আয়েসি গলায় বললেনÑ‘ভালো রান্না হচ্ছেরে। তোর ফুপুরা এসেছে তোর বাবাকে দেখতে।’
আমার তখন ইচ্ছে হলো চুলো থেকে মোরগ পোলাও পাতিলটা ছুঁয়ে ফেলে প্রতিবাদের গলায় বলিÑ‘চরম অভাবের দিনে পেটের ক্ষুধায় আমরা যখন দু বেলা আটার রুটি আর পানি খেয়ে দিন কাটিয়েছি, তখন কোথায় ছিল এসব ফুপুরা?’
এসব ভাবছি আর দেখছি মা বড় ফুপুর সাথে কি সব আহ্লাদি গল্প জুড়ে দিলেন। মা হয়তো ভুলেই গেছেন তার স্বামীর এই বোনটি একদিন তাকে টাকা ধার চাইবার অপরাধে ‘ফকিন্নি’ বলে কি অপমানই না করেছে।